শনিবার, জুন 15, 2024

শামার জোসেফএক সাহসী যোদ্ধার নাম

Must read

- Advertisement -
শামার জোসেফএক সাহসী যোদ্ধার নাম | ছবির মানুষটির নাম শামার জোসেফ। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম বলেই উইকেট শিকার করেছেন অসীদের বিপক্ষে। সেটিও স্টিভেন স্মিথের...

ছবির মানুষটির নাম শামার জোসেফ। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম বলেই উইকেট শিকার করেছেন অসীদের বিপক্ষে। সেটিও স্টিভেন স্মিথের…

৮৪ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোনো বোলার টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম বলেই উইকেট নিতে পারলেন…

এরপর মার্নাস লাবুশেনের উইকেটও নিয়েছেন তিনি। ও হ্যাঁ, বোলিংয়ের আগে ব্যাটিংয়েও ঝলক দেখিয়েছেন টেস্ট অভিষেকে। ১১ নম্বরে নেমে ৪১ বলে ৩৬ রান করেছেন। শেষ জুটিতে কেমার রোচের সঙ্গে ৫৫ রানের জুটি গড়েছেন…

সব মিলিয়ে, টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম দিনটি স্বপ্নময় কেটেছে তার…

দারুণ ব্যাপার বটে। তবে আজকের এই দিনটিতে তার আসার গল্প আরও রোমাঞ্চকর ও প্রেরণাদায়ী…

এই তো, বছর দেড়েক আগেও তিনি চাকরি করতেন একটি সিকিউরিটি ফার্মে। তখন নৈশপ্রহরীর কাজ করেছেন, দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেছেন। উপায় ছিল না, ততদিনে বাবা হয়েছেন, পরিবার আছে, সংসার তো চালাতে হবে…!

তাকে বুঝতে হলে আরেকটু পেছনে যাওয়া যেতে পারে। তিনি উঠে এসেছেন বারাকারা নামের এক গ্রাম থেকে। গায়ানার রাজধানী জর্জটাউন থেকে অনেক দূরে বিচ্ছিন্ন এক গ্রাম সেটি। সেখানে যাওয়ার একমাত্র উপায় ২২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথ। গাছগাছড়ায় ভরা সেই নদীপথ পাড়ি দিতে কখনও কখনও দুই দিনও লেগে যায়…

গ্রামের জনসংখ্যা এখন সাড়ে তিনশ। ২০১৫ সালের আগে সেখানে কোনো স্থানীয় সরকার ছিল না। টেলিফোন ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে এই তো কেবল ২০১৮ সালে। এই গ্রামেই তার জন্ম ১৯৯৯ সালের অগাস্টে। বেড়ে ওঠা সেখানেই…

এটি মূলত মেরুনদের গ্রাম। আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে আনা হয়েছিল যাদের, পরে দাসত্বের শেকল ভেঙে যারা নিজেদের আবাস গড়েছিলেন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের নানা প্রান্তে। গায়ানার একমাত্র মেরুন গ্রাম এটি। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে মেরুনরা আবাস গড়েছিলেন এখানে…

এই গ্রামে স্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে একটি, আছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাধ্যমিক শিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই এখনও। গ্রামের মানুষের মূল পেশা কৃষি আর গাছ কাটা। ভালো কোনো চিকিৎসা বা আধুনিকতার খানিকটা ছোঁয়া পেতে হলেও নদীপথে অনেকটা পাড়ি দিয়ে তাদেরকে যেতে হয় নিউ আমস্টারডাম শহরে…

কৃষি কাজ আর ঘরের কাজ ফাঁকি দিয়ে ছেলেবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলতেন তিনি। কখনও লেবু, কখনও পেয়ারা দিয়ে বোলিং করতেন। কাঠের টুকরা, গাছের ডাল সবসময় তার সঙ্গে থাকত, কারণ সেসবই ছিল তার ব্যাট…

একসময় টেপ টেনিসে খেলা শুরু করলেন। গ্রামজুড়ে তার ক্রিকেট প্রতিভার কথা ছড়িয়ে পড়ল। আরেকটু বড় হয়ে মাঝেমধ্যে নিউ আমস্টারডাম শহরে খেলতে যেতেন। তখন কোর্টনি ওয়ালশ, কার্টলি অ্যামব্রোসদের গল্প শুনে, ভিডিও ক্লিপ দেখে, তাদের মতো বোলিং করার চেষ্টা করতেন। এভাবেই একসময় সুযোগ পেয়ে যান ওই শহরের ক্লাব টাকবার পার্কে। যে ক্লাব থেকে উঠে এসেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এখনকার দলের অলরাউন্ডার রোমারিও শেফার্ড। ক্রিকেট নিয়ে বড় স্বপ্ন ছিল তার বরাবরই। তবে স্বপ্নগুলো সত্যিকারের ভিত্তি পায় এই ক্লাবে যাওয়ার পর…

তার জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার শুরু ২০২২ সালে নিউ আমস্টারডামে একটি ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে। প্রতিভা বাছাই করতে আসা কিংবদন্তি কার্টলি অ্যামব্রোসের নজর কাড়েন তিনি। আলাদা করে তার কথা বলে যান অ্যামব্রোস। ক্লাবও তখন তার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়। ক্লাব তাকে জানিয়ে দেয়, ক্রিকেটের পথে চলতে হলে সিকিউরিটি ফার্মের চাকরি ছাড়তেই হবে…

দ্বিধায় পড়ে যান তিনি। পাঁচ ভাই তিন বোনের বিশাল সংসারে বেড়ে উঠেছেন। আর্থিক কষ্ট থাকলেও না খেয়ে থাকতে হয়নি কখনও। মাছ ধরে, কৃষি কাজ করে খেয়েপরে থাকতে পারতেন সবাই। তবে সেটুকুর জন্য নিত্যদিনের খাটুনি করতেই হতো। ক্রিকেটের স্বপ্ন পূরণের তাড়নাতেই গ্রাম ছেড়ে এসে ওই সিকিউরিটি ফার্মের চাকরি করছিলেন আর পাশাপাশি খেলছিলেন। সেই চাকরি ছেড়ে দিলে এক বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে তার সংসার কীভাবে চলবে, এসবই ভাবছিলেন…

সেসময় তার সঙ্গিনী তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি ক্রিকেটই খেলতে চাও, জাস্ট গো অ্যান্ড ডু ইট। যা করতে ভালোবাসো, সেটিই করো। আমি আছি তোমার পাশে। পাশে থাকা মানে শুধু আর্থিক সমর্থনই নয়, আমি সবসময় আছি তোমার জন্য… তুমি নিজের স্বপ্নের পথে থাকো, প্রেরণা দেওয়ার জন্য আমি আছি…”

এই ভরসাটুকু পাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্লাব ক্রিকেট খেলে দ্রুতই গায়ানার ক্রিকেটের মূল স্রোতে চলে আসেন। গায়ানার দ্বিতীয় একাদশের হয়ে আঞ্চলিক ক্রিকেটে দুটি ম্যাচ খেলেই মূল দলে জায়গা করে নেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গায়ানার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়ে যায়…

তার গ্রাম বারাকারায় উৎসবের জোয়ার বয়ে যায় সেদিন। ওই গ্রাম থেকে উঠে এসে কেউ গায়ানার হয়ে খেলবে, গ্রামের মানুষের কাছে কল্পনাতীত ছিল তা…

কিন্তু তার স্বপ্নের সীমানা তো ছিল আরও বড়। অভিষেকে তিন উইকেটের পর দ্বিতীয় ম্যাচেই স্বাদ পেয়ে যান প্রথমবার ৫ উইকেটের। মৌসুমে তিনটা ম্যাচ খেলতে পারেন। তার বোলিং দেখে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে তাকে নেট বোলার হিসেবে রাখা হয়। নেটেও নজর কেড়ে তিনি টুর্নামেন্টের শেষ দিকে মূল দলে জায়গা করে নেন…

সিপিএলে দুটি ম্যাচ খেলে উইকেট পাননি। তবে তার প্রতিভা চাপা থাকেনি। গত নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলে তাকে নেওয়া হয়। সেই সফরে দুই ম্যাচে শিকার করেন ১২ উইকেট। এরপরই অস্ট্রেলিয়া সফরের ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট দলে জায়গা পেয়ে যান স্রেফ পাঁচটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতায়। প্রস্তুতি ম্যাচে ভালো করার পর আজকে অ্যাডিলেইডে তাকে টেস্ট ক্যাপ পরিয়ে দেন ইয়ান বিশপ। এরপর তো দিনটি আরও স্মরণীয় করে রাখেন ব্যাটে-বলে পারফরম্যান্সে…

এখন তিনি দুই সন্তানের বাবা। সুখী পরিবার। বারাকারায় গোটা গ্রামটাই অবশ্য সবার পরিবার। আজকে খেলা শেষে তিনি বলেছেন, “বারাকারায় নিশ্চিতভাবেই কেউ আজকে রাতে ঘুমায়নি। সবার চোখ ছিল টিভি পর্দায়। আমার জন্য তাদের সাপোর্ট দারুণ। এখান থেকেও তা অনুভব করতে পারছি আমি। ওই গ্রামের প্রথম কেউ ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলছে, এই আনন্দই ওদের কাছে অনেক কিছু। আমিও বারাকারার জন্য অনেক কিছু করতে চাই…”

তার গল্প জানার পর খুঁজে দেখলাম, বারাকারা গ্রাম নিয়ে দারুণ কিছু লেখা আর ডকুমেন্টারি আছে। সেসব পড়লে বা দেখলে আরও ভালো করে বোঝা যায়, কোন দুর্গম দুনিয়া থেকে উঠে এসেছেন তিনি…

দেড় বছর আগেও যিনি ছিলেন নাইটগার্ড আর বডিগার্ড, জীবন ছিল প্রবল অনিশ্চয়তার মোড়ে, সেই তিনি আজ ক্রিকেটবিশ্বে তাক লাগিয়ে অ্যাডিলেইড ওভালের সবুজ আঙিনায় ছুটেছেন সাফল্যের খ্যাপাটে দৌড়ে…

কেমন রূপকথার মতো শোনায় …!

আদতে পরিশ্রম, প্রতিজ্ঞা, ত্যাগ আর বিন্দু বিন্দু ঘাম দিয়ে তিনি লিখেছেন জীবনের গল্প। কারও কাছে তা প্রেরণার কাব্য, কারও কাছে সংগ্রামের উপাখ্যান, কারও চোখে রূপকথা…

- Advertisement -
- Advertisement -

More articles

- Advertisement -

Latest article